সানেন চার্চের গল্প
সুইৎজারল্যান্ড এমনিতেই ছবির মতন দেশ। তার উপর ঢেউ খেলানো সবুজ মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা কাঠের বাড়ি, বা শ্যালে, আর মাথায় চোঙা বসানো চার্চগুলো দেখলে মনে হয় ট্রেন থেকে নেমে হেঁটেই ঘুরি সব। এরকমই এক শ্যালে ভর্তি গ্রামের চোঙা বসানো চার্চের গল্প বলব আজকে।
![]() |
| সানেন চার্চ |
সানেন গ্রামের এই চার্চ বেশ পুরনো। কবে তৈরি করা হয়েছিল তা ঠিকঠাক বলা না গেলেও ১২২৮ সালের লেখায় এখানে চার্চের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এখন যেটা আমরা দেখতে পাই তার নির্মানকাল ১৪৪০ এর দশক। এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বড়সড় করে নতুন ভাবে এটা বানানো হয়। আর এই সময়েই আঁকা হয় এর দেওয়ালের অপূর্ব মুর্যালগুলি। মেরির জীবনী, যাঁর নামে এই চার্চ, সেই সেন্ট মরিস ও তাঁর থিবান সৈন্যবাহিনীর কথা ( খ্রিষ্টধর্ম গ্রহন করার জন্য রোম এদের ৬৬৬৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দেয় ২৮৬ সালে), ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনি, এই সবই আঁকা আছে চার্চের দেওয়ালে।
![]() |
| সানেন চার্চের মুর্যাল |
১৫৫৬ সালে ক্যাথলিকদের হাত থেকে এই চার্চ চলে যায় প্রটেস্টান্টদের হাতে। ওল্টার, মূর্তি সব সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৬০৪ সালে সাদা রঙ করে ঢেকে দেওয়া হয় মুর্যালগুলিও। তিনশ বছরের উপর কেটে যায় এইভাবে। ১৯৪০ এর জুন মাসে বাজ পরে চার্চের টাওয়ারে। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ভেঙ্গে পড়ে বেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলেও সবার চেষ্টায় ১৯৪২ সালে আবার গড়ে তোলা হয় চার্চ। নতুন বেলও লাগানো হয় পরে। এর আগে ১৯২৭ সালে সাদা রঙ তুলে বের করে আনা হয়েছে সেই পুরনো মুর্যালগুলিও। বহুদিন বাদে স্বমহিমায় ফিরে আসে এই সুন্দর চার্চটি।
![]() |
| ইহুদী মেনুহিন |
এর মধ্যে সানেন আর পাশের গ্রাম স্তাদে খুলেছে স্কি রিসর্ট। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ট্যুরিজম, খুলছে বিলাসবহুল সব হোটেল। দেখা যাচ্ছে বিখ্যাত সব লোকেদের। তাদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি বানাচ্ছেন এখানে। কিন্তু তবুও, এত কিছুর পরেও সুইৎজারল্যান্ডের ছোট্ট এক গ্রামের অনামী সুন্দর একটি চার্চ হয়েই রয়ে যেত এটি। যদি না ১৯৫৭ সালে এখানে এসে আস্তানা গাড়তেন প্রখ্যাত বেহালাবাদক ও সঞ্চালক ইহুদী মেনুহিন। ওই বছরই মেনুহিন চালু করলেন স্তাদ মেনুহিন ফেস্টিভাল। সানেন চার্চে হল তার প্রথম পরিবেশনা। তার পর থেকে আজ অবধি বিখ্যাত সব সংগীতজ্ঞ এসেছেন এই উৎসবে। বর্তমানে সানেন ছাড়াও আশেপাশের আরো কিছু গ্রামের চার্চ ও অন্য জায়গা মিলিয়ে অনেকদিন ধরে চলে এই উৎসব। ইউটিউবে খুঁজলেই দেখা সম্ভব বেশ কিছু ভিডিও।
![]() |
| সানেন স্টেশন |
![]() |
| স্টেশনের পাশের ব্রিজ |
অবশ্য যারা বলিউডি সিনেমার ভক্ত, তাদের কাছে সানেনের গুরুত্ব অন্য। কারন এই সানেন, স্তাদ আর আশেপাশের কিছু জায়গাতেই তোলা হয় “দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে”-র ইউরোপ ভ্রমণের বেশিরভাগটাই। এই সানেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসেই সিমরান জানায় তার বিয়ের খবর। আরেকটু এগোলে সানেন এয়ারফিল্ড। সিনেমার শুরুতে “মেরে খাবোঁ মে জো আয়ে” গানে এখানেই ছোট প্লেনের পাশে দৌড়তে দেখা যায় রাজকে। একটু পিছিয়ে, স্টেশন থেকে শখানেক মিটার দুরে, সেই “পালাট” ব্রিজ। ব্রিজের উল্টোদিকের বাস স্টেশন থেকেই বাস ধরে দুজনে। আর তার আগে যেই সুন্দর চার্চটা দেখতে পায় সিমরান, সেটাই এই সানেন চার্চ। ভিতরের শ্যুটিং অবশ্য করা হয় মুবভঁ নামে অন্য একটি গ্রামের চার্চে।
![]() |
| মুবভঁ গ্রামের চার্চ |






